এক দশক ধরে ভারতের ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার নীতি অনুসরণ করে আসছে। শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগই নয়, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, এমনকি ক্রীড়াক্ষেত্রের যোগাযোগও কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে—২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর,
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের
মে মাসে ভারত পাকিস্তানের
বিরুদ্ধে তিন দফা সরাসরি
সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
দক্ষিণ
এশিয়ায় যখন দূরত্ব ও
বৈরিতা ক্রমেই বাড়ছে, তখন বিশ্বের অন্য
প্রান্তে ভূরাজনীতির চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। পশ্চিম
এশিয়া, ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ায়
বড় বড় কৌশলগত পরিবর্তন
ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্র
ও ইরান চল্লিশ দিনের
এক যুদ্ধের পর এখন শান্তি
চুক্তির পথে এগোচ্ছে। সেখানে
পাকিস্তান ও কাতার মধ্যস্থতাকারীর
ভূমিকা নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের
প্রতিযোগিতাকে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র পথে পরিচালিত
করতে সম্মত হয়েছে।
১৯৪৭
সাল থেকে চারটি প্রধান
কারণ দুই দেশের সম্পর্ককে
জটিল করে রেখেছে—পারস্পরিক
অবিশ্বাস, জম্মু ও কাশ্মীর সমস্যা,
পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে কলঙ্কিত করতে ভারতের সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত
অভিযোগের ব্যবহার এবং দক্ষিণ এশিয়ায়
প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ভারতের আকাঙ্ক্ষা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সিন্ধু
পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত এ সম্পর্ককে আরও
তিক্ত করে তুলেছে।
এখন
প্রশ্ন, সংঘাত থেকে সংলাপে ফেরা
যাবে কীভাবে? পাকিস্তান ও ভারত উভয়ই
পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, অথচ তাদের
মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে
সংকট মুহূর্তে উত্তেজনা কমানোর উপায় খুঁজে বের
করা অত্যন্ত জরুরি। ২০২৫ সালের মে
মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ
হয়নি। ফলে দুই দেশ
খাতা-কলমে এখনো যুদ্ধাবস্থাতেই
রয়েছে।
উপরন্তু,
ভারত কোনো তৃতীয় পক্ষের
মধ্যস্থতা মেনে নিতে চায়
না। এ পরিস্থিতিতে যদি
আবার বড় ধরনের সংকট
দেখা দেয়, তাহলে তার
ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে দুই
দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। ক্ষেপণাস্ত্র ও
সশস্ত্র ড্রোনের মতো স্বয়ংক্রিয় মারাত্মক
অস্ত্র দুই দেশের কাছেই
রয়েছে এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর
সময় খুবই কম। ফলে
যেকোনো সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বর্তমানে
দুই দেশের মধ্যে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হলো সামরিক বাহিনীর
ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনসদের
সাপ্তাহিক টেলিফোন আলাপ। তাই সংকট মোকাবিলার
জন্য আরও যোগাযোগের পথ
তৈরি করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ,
দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে।
একইভাবে দুই দেশের হাইকমিশনারদের
নিজ নিজ পদে ফিরে
যাওয়াও একটি কার্যকর পদক্ষেপ
হতে পারে।
সংকট
ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের
জন্য গোপন বা ‘ব্যাকচ্যানেল’
যোগাযোগের পথও গড়ে তোলা
প্রয়োজন। অতীতে এমন একটি ব্যাকচ্যানেল
২০০৭ সালে কাশ্মীর সমস্যার
সমাধানে চার দফা প্রস্তাব
তৈরি করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে পানিবণ্টন নিয়ে একটি পৃথক
ব্যাকচ্যানেলও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
২০২৫
সালের ২৩ এপ্রিল থেকে
ভারত সিন্ধু পানি চুক্তিকে কার্যত
স্থগিত রেখেছে। আইনের দৃষ্টিতে একতরফাভাবে এ চুক্তি স্থগিত
করা সম্ভব নয় এবং সালিসি
আদালত ইতিমধ্যেই ভারতের এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ
ঘোষণা করেছে। ভারত এই পদক্ষেপের
কারণ হিসেবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলে ধরলেও প্রকৃত
উদ্দেশ্য বলে মনে করা
হচ্ছে—পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত তিনটি
পশ্চিমা নদীতে বিভিন্ন প্রকল্প সম্পন্ন করা এবং চুক্তি
পুনর্বিবেচনায় পাকিস্তানকে চাপ দেওয়া।
সিন্ধু,
ঝিলম ও চেনাব নদীর
ওপর পাকিস্তানের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। তাই এই নদীগুলোর
পানি প্রবাহে কোনো বিঘ্ন ঘটানো
বা পানি অন্যদিকে সরিয়ে
নেওয়াকে পাকিস্তান যুদ্ধের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে।
অর্থাৎ যত দিন ভারত
এ পরিকল্পনা চালিয়ে যাবে, ততই নতুন সংঘাতের
আশঙ্কা বাড়বে। ভারত যদি জনসংখ্যা
বৃদ্ধি ও পরিবেশগত পরিবর্তনের
কথা বিবেচনায় এনে চুক্তি পুনর্বিবেচনা
করতে চায়, তাহলে প্রথমে
সিন্ধু পানি চুক্তি পুনরায়
কার্যকর করতে হবে এবং
তারপর প্রয়োজনীয় সংশোধন সংযোজন আকারে আলোচনার মাধ্যমে যুক্ত করা যেতে পারে।
পারস্পরিক
আস্থা তৈরির জন্য আরও কিছু
পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন
তীর্থযাত্রা, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ বা বিচ্ছিন্ন পরিবারের
সদস্যদের পুনর্মিলনের মাধ্যমে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ আংশিকভাবে পুনরায় চালু করা যেতে
পারে। দক্ষিণ এশিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে অত্যন্ত
ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, যা উভয় দেশের
জন্য যৌথভাবে কাজ করার একটি
বড় সুযোগও বটে। যদি যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে
নেয়, তাহলে ভারত তার পুরোনো
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে ইরান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন
প্রকল্পে ফিরে আসতে পারে।
একইভাবে তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন
প্রকল্পও উভয় দেশের জন্য
লাভজনক হতে পারে।
আঞ্চলিক
সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ এশীয়
আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাবও এসেছে।
অতীতে মঞ্চটি উত্তেজনা কমানো এবং সহযোগিতা বাড়ানোর
ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে
ভারত এই সংস্থাকে এমন
একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে, যেখানে ছোট দেশগুলো একজোট
হয়ে ভারতের প্রভাবের ভারসাম্য তৈরি করতে চায়।
ভারত যদি এই সংকীর্ণ
দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে না
আসে, তাহলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ চীনের
সঙ্গে হাত মিলিয়ে আঞ্চলিক
সহযোগিতার বিকল্প পথ খুঁজতে পারে।
পাকিস্তানের
সঙ্গে সংলাপে বসব না—মোদি
সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত
দুই দেশের দূরত্বকে দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান
একদিকে সংলাপের দরজা খোলা রাখলেও
অন্যদিকে নয়াদিল্লির সম্ভাব্য যেকোনো পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকতে
বাধ্য। একই সঙ্গে পাকিস্তানের
উচিত নিজস্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেওয়া—সুশাসন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নীতি এবং বন্ধুপ্রতিম
দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ প্রকল্প জোরদার করার মাধ্যমে।
লেখক:
সানোবর ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান
ডন,
ইংরেজি থেকে অনুবাদ