ইসরায়েলের সাথে মতবিরোধের এক বিরল ঘটনায়, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে গাজাকে জনশূন্য করার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের আহ্বানের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই ২০-দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’র প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে—যার আওতায় গত বছর ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হয়েছিল।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনার ১২ নম্বর দফায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘কাউকেই গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না এবং যারা চলে যেতে ইচ্ছুক, তারা তা যেতে বা ফিরে আসার ব্যাপারে স্বাধীন থাকবে। আমরা মানুষকে সেখানে থাকার জন্য উৎসাহিত করব এবং তাদের একটি উন্নত গাজা গড়ে তোলার সুযোগ করে দেব।’

মুখপাত্র আরও বলেন, “গাজার জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা, বহিষ্কার করা বা বাধ্যতামূলকভাবে স্থানান্তরের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।”

কাৎজ দাবি করেন যে, ট্রাম্প ওই অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তাঁর সমর্থন কেবল ‘স্থগিত’করেছিলেন—বাতিল করেননি। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এমন প্রস্তাব বাস্তবায়ন জাতিগত নিধনের শামিল।

বুধবার কাৎজ বলেন, “শেষ পর্যন্ত, এই স্থানান্তর ছাড়া গাজার কোনো প্রকৃত সমাধান নেই।”

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গাজাকে জনশূন্য করার বিষয়টিকে বোঝাতে ‘মাইগ্রেশন’ বা ‘স্থানান্তর’-এর মতো পরিভাষা ব্যবহার করে আসছেন।

কাৎজ জানান, ইসরায়েলি সরকার ফিলিস্তিনিদের যেকোনো উপায়ে গাজা থেকে সরিয়ে দিতে প্রস্তুত এবং বিষয়টি নিয়ে “সবসময়ই আলোচনা চলছে”।

এর একদিন পর জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও কাৎজের বক্তব্যকে সমর্থন করেন।

বেন-গভির বলেন, “এখন শান্তির অলীক কল্পনার পরিবর্তে আমাদের প্রয়োজন দেশত্যাগের পদক্ষেপ। [ফিলিস্তিনিদের] সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পরিবর্তে এখন সময় হয়েছে সুটকেস গুছিয়ে নেওয়ার।”

আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাকে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।

গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েল উভয়ই ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু এরপরও ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করে চলেছে।

সংকট সমাধানের লক্ষ্যে গত মাসে ট্রাম্পের জামাতা ও মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার হামাস কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

তবে তাকে ইসরায়েলি সরকারের অবস্থানই গ্রহণ করতে দেখা গেছে; তিনি বলেছিলেন যে, হামাসকে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত গাজায় কোনো পুনর্নির্মাণ কাজ হবে না। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র "ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সীমাবদ্ধ" করবে না।

হামাস অস্ত্র ত্যাগ করতে সম্মত হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের "যুদ্ধবিরতি" পরিকল্পনার ক্ষেত্রে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অনড় অবস্থান আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, যেকোনো স্থানান্তর প্রক্রিয়া অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন হতে হবে এবং আমাদের মূল লক্ষ্য হলো গাজার বাসিন্দাদের কল্যাণে অঞ্চলটির নিরস্ত্রীকরণ, স্থিতিশীলতা ও পুনর্উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

আরব সেন্টার ওয়াশিংটন, ডিসি-র ফিলিস্তিন/ইসরায়েল কর্মসূচির প্রধান ইউসুফ মুনায়েয়ার বলেছেন, শান্তি প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কারণ হলো ইসরায়েলিরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, "এই ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সহাবস্থান সম্ভব নয়"।

তিনি সতর্ক করে বলেন যে, ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার এই প্রচেষ্টা কেবল গাজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত।

মুনায়েয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, "তারা কোনোভাবেই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বসবাস করতে চায় না।" “তাদের যে মৌলিক সমস্যা—অর্থাৎ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের চাপিয়ে দিয়ে তারা পুরো জনগোষ্ঠীকে বৈরী করে তুলেছে—তার কোনো সমাধানের কথা তারা সেই জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া আর কোনোভাবেই ভাবতে পারছে না,” মুনাইয়ার বলেন।

আল জাজিরা